জনসভা
আমার তখন বয়স নয় বছর। গ্রামের উচ্চ-প্রাইমারি স্কুলে পড়ি এবং বয়সের তুলনায় একটু বেশি পরিপক্ক। বিনু একদিন ক্লাসে একখানা বই আনিল, ওপরে সোনালিফুল হাতে একটি মেয়ের ছবি (ত্রিশ বছর আগেকার কথা বলিতেছি মনে রাখিবেন), রাঙা কাগজের মলাট, বেশি মোটা নয়, আবার নিতান্ত চটি বইও নয়।
আমি সেই বয়সেই দু-একখানা সুগন্ধি তেলের বিজ্ঞাপনের নভেল পড়িয়া ফেলিয়াছি; পূর্বেই বলি নাই যে বয়সের তুলনায় আমি একটু বেশি পাকিয়াছিলাম! সেজন্য বিনু আমাকে ক্লাসের মধ্যে সমঝদার ঠাওরাইয়া বইখানি আমার নাকের কাছে উঁচাইয়া সগর্বে বলিল, “এই দ্যাখো, আমার দাদা এই বই লিখেছেন, দেখেছিস?”
বলিলাম, “দেখি কী বই?”
মলাটের ওপরে লেখা আছে ‘প্রেমের তুফান’। হাতে লইয়া দেখিলাম, লেখকের নাম, শ্রীভূষণচন্দ্র চক্রবর্তী। দিনাজপুর, পীরপুর হইতে গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত, দাম আট আনা।
“তোর দাদার লেখা বই, কীরকম দাদা?”
বিনু সগর্বে বলিল, “আমার বড়োমামার ছেলে, আমার মামাতো ভাই।”
এই সময় নিতাই মাস্টার মহাশয় ক্লাসে ঢোকাতে আমাদের কথা বন্ধ হইয়া গেল। নিতাই মাস্টার আপন মনে থাকিতেন, মাঝে মাঝে কী এক ধরনের অসংলগ্ন কথা বলিতেন আর আমরা মুখ-চাওয়াচাওয়ি করিয়া হাসিতাম। জোরে হাসিবার উপায় ছিল না তাঁর ক্লাসে।
অমনি তিনি বলিয়া বসিতেন, “এই তিনকড়ি, এদিকে এসো, হাসছ কেন? ছানা চার আনা সের, কেরোসিন তেল ছ-পয়সা বোতল—”
এইসব মারাত্মক ধরনের মজার কথা শুনিয়াও আমাদের গম্ভীর হইয়া বসিয়া থাকিতে হইবে, হাসিয়া ফেলিলেই মার খাইয়া মরিতে হইবে।
বর্তমানে নিতাই মাস্টার ক্লাসে ঢুকিয়াই বলিলেন, “ও-খানা কী বই নিয়ে টানাটানি হচ্ছে সব? তিনটের গাড়ি কাল এসেছিল তিনটে পঁচিশ মিনিটের সময়, পঁচিশ মিনিট লেট—অমুক বিস্কুট পয়সায় দশখানা—”
আমরা হাসি অতিকষ্টে চাপিয়া মেঝের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া বসিয়া রহিলাম।
নিতাই মাস্টার বইখানা হাতে লইয়া বলিলেন, “কার বই?”
বিনু সগর্বে বলিল, “আমার বই, স্যার। আমার দাদা লিখেছেন, আমাদের একখানা দিয়েছেন—”।
নিতাই মাস্টার বইখানা নাড়িয়া-চাড়িয়া দেখিয়া বলিলেন, “হু, থাক, একটু পড়ে দেখব।”
পরের দিন বইখানা ফেরত দিবার সময় মন্তব্য করিলেন, “লেখে ভালো, বেশ বই। ছোকরা এর পর উন্নতি করবে।”
বিনু বাধা দিয়া বলিল, “ছোকরা নন স্যার তিনি, আপনাদের বয়সি হবেন—”
নিতাই মাস্টার ধমক দিয়া বলিলেন, “বেশি কথা কইবে না, চুপ করে বসে থাকবে। আমার কথার ওপর কথা! পুরোনো তেঁতুলে অম্বলের ব্যথা সারে, আশ্বিন মাসে দুর্গাপুজো হয়।”
পুরোনো তেঁতুলে অম্বলের ব্যথা সারুক আর নাই সারুক, নিতাই মাস্টারের সার্টিফিকেট শুনিয়া বিনুর দাদার বইখানা পড়িবার অত্যন্ত কৌতূহল হইল; বিনুর নিকট যথেষ্ট সাধ্যসাধনা করিয়া সে-খানা আদায় করিলাম। বাড়িতে বাবা ও বড়োদার চক্ষু এড়াইয়া বইখানাকে শেষ করিয়া বিনুর এই অদেখা দাদাটির প্রতি মনে মনে ভক্তিতে আপ্লুত হইয়া গেলাম। একটি মেয়েকে কী করিয়া দুষ্ট লোক ধরিয়া লইয়া গেল, নানা কষ্ট দিল, অবশেষে মেয়েটি কীভাবে জলে ডুবিয়া মরিল, তাহারই অতিমর্মন্তুদ বিবরণ। পড়িলে চোখে জল রাখা যায় না।
কয়েক মাস কাটিয়া গিয়াছে, একদিন বিনু বলিল, “জানিস পাঁচু, আমার সেই দাদা, যিনি লেখক, তিনি এসেছেন কাল আমাদের বাড়ি।”
অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া উঠিলাম, “কখন এসেছেন? এখনও আছেন?”
“কাল রাতের ট্রেনে এসেছেন, দু-তিনদিন আছেন।”
“সত্যি? মাইরি বল—”
“মা-ইরি, চল বরং, আয় আমাদের বাড়ি।’
আমার ন-দশ বত্সর বয়সে ছাপার বই কিছু কিছু পড়িয়াছি বটে, কিন্তু যাহারা বই লেখে তাহারা কীরূপ জীব কখনো দেখি নাই। একজন জীবন্ত গ্রন্থকারকে স্বচক্ষে দেখিবার লোভ সংবরণ করিতে পারিলাম না, বিনুর সহিত তাহার বাড়ি গেলাম।
বিনুদের ভেতর-বাড়িতে একজন একহারা কে বসিয়া বিনুর মার সঙ্গে গল্প করিতেছিল, বিনু দূর হইতে দেখাইয়া বলিল, ‘উনিই’। আমি কাছে যাইতে ভরসা পাইলাম না। সম্ভমে আপ্লুত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments